খুবিতে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান: জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারীরা কোনোদিন পরাজিত

হতে পারে না: ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন

# বঙ্গবন্ধুর মতো জাতীয়তাবাদী নেতা পৃথিবীতে আজও জন্মগ্রহণ করেননি

# বঙ্গবন্ধুর রক্তের ঋণ শোধ করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হলো সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও আদর্শ

নিয়ে কাজ করে তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা


জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর  ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন বলেছেন বঙ্গবন্ধুর মতো জাতীয়তাবাদী নেতা পৃথিবীতে আজও জন্মগ্রহণ করেননি। তাঁর মতো কেউ হৃদয় থেকে এই দেশ ও বাঙালি জাতিকে এতো ভালবাসতে পারেনি। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ, আর এদেশের কৃষক, শ্রমিক তথা সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নই ছিলো জীবনের প্রধানতম লালিত স্বপ্ন। রক্ত দিয়ে, জীবন উৎসর্গ করে সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর রক্তের ঋণ শোধ করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হলো সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও আদর্শ নিয়ে কাজ করে তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা। তাঁরই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশ আজ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার সাফল্যের সিংহ তোরণের অদূরেই পৌঁছে গেছে। যারা বাংলার শত্রু, বঙ্গবন্ধুর শত্রু, যারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের ধারা বাঁধাগ্রস্থ করতে চায় তাঁরা দেশ ও জনগণের শত্রু, সেই শত্রুদের ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের দমন করতে হবে। আমাদের সবসময়ই মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারীরা কোনোদিন পরাজিত হতে পারে না। বঙ্গবন্ধুই আমাদের এগিয়ে চলার প্রেরণার উৎস। 

তিনি আজ ২৮ আগস্ট, বুধবার, সকাল ১১ টায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু একাডেমিক ভবনের সাংবাদিক লিয়াকত আলী মিলনায়তনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাৎ বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান: জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক আলোচনা সভায় মূখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখছিলেন।  খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় মূখ্য আলোচক প্রায় দুইঘণ্টা যাবত প্রদত্ত তার অভিভাষণে সুপ্রাচীন কাল থেকে বাংলার ঐতিহ্য, গৌরব ও বিদেশি শাসকদের দ্বারা সম্পদ লুণ্ঠন, শোষণ, জুলুমের সারসংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরে বলেন দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বিভক্ত পাকিস্তান শব্দের মধ্যে কোথাও বাংলার কোনো অক্ষর ছিলো না। পশ্চিমারা আমাদের দেশে উৎপাদিত পাটসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি থেকে অর্জিত সম্পদ এককভাবে ভোগ করে বাঙালিদের শোষণ, শাসন, নিপীড়ন করে। বঙ্গবন্ধু চিরকাল সাধারণ মানুষের সাথে মিশেছেন, তাদের দুঃখ-দুর্দশা বুঝে ছিলেন। তিনিই জানতেন স্বাধীন সার্বভৌম দেশ ও জাতি ছাড়া এ দেশের মানুষের মুক্তি নেই। আর এ চিন্তা ও আদর্শ ধারণ করেই জেল জুলুম জীবনাশংঙ্কা সত্ত্বেও রাজনীতিতে সামনে এগিয়েছেন, এদেশের সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করেছেন এবং এমনকি পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রীর পদ থেকেও ইস্তেফা দিয়েছেন। তিনি প াশ ও ষাট দশকের সেই রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক তুলে ধরে বলেন বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ছিলো বঙ্গবন্ধুর একান্ত চিন্তাপ্রসূত ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি বলেন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, জনমত গঠনের যাদুকরী শক্তি ও বিশ্বের কাছে অসীম জাতীয়তাবাদী শক্তির এই নেতা ছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভ অসম্ভব ছিলো এবং এমন জনযুদ্ধে বিজয় লাভ সম্ভব হতো না। ঐতিহাসিক ৭মার্চের ভাষণের মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা নিহিত বলে বিশ্বাস করেন তিনি। বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ড. ফরাস উদ্দিন বলেন স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি খুব কাছ থেকেই বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন এবং তার জীবনে এমন বাঙালি দরদী, এমন দক্ষ ও দূরদর্শী শাসক আর দেখেননি। তিনি বলেন বঙ্গবন্ধু তার কোনো নেতা কর্মীর স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা শুনলেও কাদঁতেন। শিশু, অসহায় মহিলা, দুঃস্থ, দরিদ্র মানুষদের দেখলে সবসময় তিনি তাদের সাথে মিশতেন, কিছু করার চেষ্টা করতেন। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন এবং সেখানে দল না দেখে যাকে যেখানে লাগালে কাজ হয় সে কাজ করেছেন। তিনি এতোটাই উদার ছিলেন যে, তার বিরুদ্ধাচরণকারী রাজনীতিকদের দুঃসময়ে অর্থনৈতিক সহায়তা করেছেন। ১৯৭২-৭৩ সাল ছিলো পৃথিবীর অর্থনীতিতে কঠিন সময়। তিনি আরও বলেন বঙ্গবন্ধুর সাড়ে ৩ বছরের শাসন আমলে রাষ্ট্রীয় কেনা-কাটার ব্যাপারে কোনোদিন কোনো অভিযোগ ওঠেনি। ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৮.৪শতাংশে দাড়াঁয় যা ছিলো ঈর্ষনীয়। খন্দকার মোশতাকের মতো বেঈমান, নরাধম খুব কাছে থেকেও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলো। বঙ্গবন্ধু সবাইকে অগাধ বিশ্বাস করতেন, সবার ওপর আস্থা করতেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি দেশি-বিদেশি এবং আন্তর্জাতিক কু-চক্রী মহল বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চায়নি। নানা গুজব রটিয়ে, মিথ্যাচার করে সমাজে ধু¤্রজাল সৃষ্টি করে অস্থিরতা তৈরি করে। তিনি বলেন পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের আগে গোয়েন্দা প্রধানরাও সঠিক তথ্য বঙ্গবন্ধুকে জানায়নি, বরং তারা ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলো। তিনি বলেন ১৯৮১ সালে গোলাম আযমকে দেশে ফিরতে না দিলে জামাত-শিবির সংঘটিত হতে পারতো না। জিয়া, এরশাদ, খালেদার আমলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সংগঠন ফ্রিডম পার্টিকে রাষ্ট্রীয় মদদে প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হয়। আবারও বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তসুরী শেখ হাসিনাকে বার বার হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। এর কারণ তিনি একাত্তরের পরাজিত শক্তির সাথে কোনো আপোষ করেননি এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁরই  দূরদর্শী নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে এবং দেশ বিশ্বের সবচেয়ে উদীয়মান অর্থনীতি বিকাশের দেশে পরিণত হয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। তিনি বলেন শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার সাফল্যের সিংহ তোরণের অদূরেই আমরা পৌঁছে গেছি। যারা বাংলার শত্রু, বঙ্গবন্ধুর শত্রু, যারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের ধারা বাঁধাগ্রস্থ করতে চায় তারা জনগণের শত্রু, সেই শত্রুদের ঐক্যবদ্ধভাবে দমন করতেই হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সর্ম্পকে বলতে গিয়ে তিনি বলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে শিক্ষকরা ছিলেন শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ স্থানে, ছাত্ররা ছিলো তাঁর হৃদয়ের মনি কোঠায়। তিনি পিএসসি, ইউজিসি, শিক্ষা সচিব, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শিক্ষকদের দায়িত্ব দিয়ে ছিলেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো জায়গায় পরীক্ষা নিতে গিয়ে দেখেছি এখানকার গ্রাজুয়েটরা যথেষ্ট ভালো করছে, তারা দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হচ্ছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। 

সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিলো নির্দিষ্ট দর্শনের ভিত্তিতে। যা রাষ্ট্রীয় চার নীতির মধ্যে অন্তর্নিহিত। ১৯৭৫ সালের পনেরই আগস্টের আগে পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর শাসন আমলে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনৈতিক  প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হতে থাকে। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শক্তি এ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সাফল্য কোনো কিছুই ভালোভাবে নেইনি। পরাজিত শক্তির দোসর মোশতাকসহ কয়েকজন গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। নানা গুজব রটিয়ে, মিথ্যাচার করে সমাজে ধু¤্রজাল সৃষ্টি করে অস্থিরতা তৈরি করতে থাকে। তিনি বলেন মাত্র কয়েকজন বিপথগামী সেনার হাতেই পনেরই আগস্টের হত্যাকান্ড ঘটেনি এর নেপথ্যে ছিলো দেশি-বিদেশি এবং আন্তর্জাতিক গভীর ষড়যন্ত্র যাতে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানী আদলে বা ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু তারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করলেও তাঁর আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু মিশে আছেন বাংলার প্রান্তরে, প্রকৃতিতে, আকাশে-বাতাসে, মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়। তিনি বাঙালিকে যে প্রেরণা দিয়েছেন সেই প্রাণশক্তি কেউ থামাতে পারবে না। আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ডিসিপ্লিন প্রধান প্রফেসর ড. মোসাম্মাৎ হোসনে আরা। আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর সাধন রঞ্জন ঘোষ, ডিনবৃন্দ, রেজিস্ট্রার, ডিসিপ্লিন প্রধান, বিভাগীয় প্রধানসহ বিপুল সংখ্যক শিক্ষক, কর্মকর্তা কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। পরে মূখ্য আলোচক ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন পনেরই আগস্ট উপলক্ষে আইন ডিসিপ্লিন কর্তৃক মুদ্রিত অগ্নিগিরির অস্তাচলে শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকাশনার মোড়ক উম্মোচন করেন। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান, ট্রেজারার প্রফেসর সাধন রঞ্জন ঘোষ, আইন স্কুলের ডিন প্রফেসর ড. মোঃ ওয়ালিউল হাসানাত এবং প্রকাশনাটির সম্পাদক সহকারী অধ্যাপক তালুকদার রাসেল মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছিলে উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিনকে স্বাগত জানান।