বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও স্বাতন্ত্র্য চেতনায় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলো : ড. আতিউর রহমান

মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আজ ২১ ফেব্রুয়ারি রবিবার সকাল ১০টায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ ভবনের সম্মেলন কক্ষে ‘বায়ান্ন থেকে একাত্তর: উৎস থেকে মোহনায়’ শীর্ষক ওয়েবিনারে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বে নিয়োজিত উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মোসাম্মাৎ হোসনে আরার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান।
তিনি বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের আগে এবং পরে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, শ্রেণি বৈষম্য, মধ্যবিত্ত, কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন ভাষা আন্দোলন বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও স্বাতন্ত্র্য চেতনায় বিস্ফারণ ঘটিয়েছিলো। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়। ভাষা আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকরাও এ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে এ আন্দোলন রাজপথে নেমে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমানও প্রত্যক্ষভাবে এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরবর্তীতে চুয়ান্ন’র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এ সকল স্তরের আন্দোলন সংগ্রাম চালিত করেছে মূলত বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও প্রভাব। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ সকল স্তরে প্রত্যক্ষভাবে নেতৃত্বদান করেন। একই সাথে তার দূরদর্শিতা ও ত্যাগের কারণেই সকলকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হয়। আর এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের রূপ লাভ করে।
তিনি বলেন ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের  প্রাক্কালে ও সমকালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তৎকালীন ছাত্র সমাজ পাকিস্তানের পক্ষে নামে। অথচ দেশ ভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তারা পূর্ব পাকিস্তানের উপর সব ধরনের বঞ্চনার সৃষ্টি করে। বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ শুরু হলে বাঙালির আন্দোলন শুরু হয়। মূলত পকিস্তানের প্রতি মোহ কেটে যাওয়া কাজ করে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ও ঔপনেবেশিক ভাবধারার পশ্চিমা শাসন। তাই বৈষম্য ও বঞ্চনা বাড়ার সাথে সাথে শাণিত হয় বাঙালির জাতীয়তাবাদ চেতনা। যেই চেতনায় শেষ পর্যন্ত একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং ২৫ মার্চ কালরাতের হত্যাযজ্ঞে চাপা পড়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি। বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও নেতৃত্বে জন্মলাভ করে বাঙালির হাজার বছরের লালিত স্বপ্নের বাংলাদেশ। তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার পক্ষে ছিলেন। তার চিন্তা ছিলো সব ধর্মের মানুষ নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। যে কারণে আজকের এই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বাংলাদেশের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
সভায় আলোচক হিসেবে আরও বক্তৃতা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর সাধন রঞ্জন ঘোষ।
সভাপতির বক্তৃতা উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বে নিয়োজিত উপ-উপাচার্য বলেন মুখ্য আলোচক যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের আগে এবং পরে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সামগ্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে। একই সাথে ইতিহাসের এই ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে আমরা সমৃদ্ধ হয়েছি। তিনি তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানান এবং ভবিষ্যতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ধরণের আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী এবং ফেসবুকে যারা যুক্ত ছিলেন তাদেরকেও ধন্যবাদ জানান।
মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনে এর আগে সকাল সাড়ে ৬টায় শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ প্রশাসন ভবনের সামনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলনের পর উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বে নিয়োজিত উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মোসাম্মাৎ হোসনে আরার নেতৃত্বে প্রভাতফেরি কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পৌঁছায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সেখানে তিনি শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন। এ সময় ট্রেজারার, বিভিন্ন স্কুলের ডিন, রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত), ডিসিপ্লিন প্রধান, ছাত্র বিষয়ক পরিচালক, প্রভোস্ট, বিভাগীয় প্রধানবৃন্দ, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। এর পরপরই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিসিপ্লিন, আবাসিক হলসমূহ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, অফিসার্স কল্যাণ পরিষদ, চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু কর্মকর্তা পরিষদ, কর্মচারী ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা হয়। পরে উপ-উপাচার্য আইন ডিসিপ্লিনের উদ্যোগে প্রকাশিত একুশের স্মরণিকা দেয়াল ভাঙ্গার গান এর পঞ্চম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন। এসময় আইন স্কুলের ডিন ও আইন ডিসিপ্লিন প্রধান প্রফেসর ড. মোঃ ওয়ালিউল হাসানাত এবং ডিসিপ্লিনের শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বাদ যোহর বিশ্ববিদ্যালয় জামে মসজিদে দোয়া মাহফিল, মন্দিরে প্রার্থনা এবং সন্ধ্যা ৬-৩০ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন।