খুবির আইন ও বিচার ডিসিপ্লিনে শিক্ষক শিক্ষার্থী আর অভিভাবকদের অভূতপূর্ব মিলনমেলা, ভর্তিকৃত প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের বছরপূর্তির আগেই শিক্ষাকোর্স সম্পন্ন


Khulna University photo-3

তাঁরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার ডিসিপ্লিনের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পিতা-মাতা তথা অভিভাবক। কেউ এসেছেন স্বামী-স্ত্রী, কেউ একা, আবার কেউ কোলের শিশু সন্তানকে নিয়ে। তাঁরা এসেছিলেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে। পেশায় কেউ কৃষক, কৃষাণী, কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কেউবা শিক্ষক, কেউ চাকরিজীবী বা অন্যান্য পেশাজীবী। তাদের বেশিরভাগই জীবনে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পা রাখেননি, স্বপ্নেও ভাবেননি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এতোটা সম্মানিত হবেন। সন্তানদের লেখাপড়ার এক বছরের কথা শুনতে, দেখতে তাঁদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয় টার্ম রিভিউ অনুষ্ঠানে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানদের ভর্তি করানোর পর তাদের সার্বিক কার্যক্রম অবহিত করতে, পর্যালোচনা করতেই এমন আয়োজন। দর্শকের গ্যালারিতে অসীম কৌতুহল নিয়ে বসেছিলেন শিক্ষার্থীদের পিতা-মাতারা। অনুষ্ঠানে তাদের সন্তানদের একবছরের লেখাপড়া ও সার্বিক বিষয়ে অভিব্যক্তি প্রকাশের পর পারফরমেন্স দেখে অনেক অভিভাবকের চোখ বেয়ে পড়ে আনন্দ অশ্রু। সন্তানরাও তাদের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। ৩৮জন শিক্ষার্থীর প্রায় সবার বক্তব্য ছিলো আমরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও বিচার ডিসিপ্লিনে ভর্তি হয়ে গত এক বছরের শিক্ষাকার্যক্রমে এমন শিক্ষক পেয়েছি তাঁরা পিতা-মাতার মতো, অভিভাবকের মতো। ফলে পুরো ডিসিপ্লিনটাই একটা পরিবার হয়ে গেছে। ক্লাশের লেখাপড়ার পাশাপাশি তাঁদের মাত্র তিনজন শিক্ষক গাইড দিয়ে তাদের শিষ্টাচার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসুলভ আচরণ ও নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগদানের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন আত্মপ্রত্যায়ী করে। তারা এখন মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে আড়ষ্টহীনভাবে, সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে, গাইতে পারে, যুক্তির শাণিতধারায় বিতর্ক করতে পারে, দুকলম লিখতে পারে। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ভালো কিছু করার জন্য। তারা মাদক ও সন্ত্রাসকে না বলেছে, প্রযুক্তি আসক্তিকে উপেক্ষা করেছে, অলসতাকে বিসর্জন দিয়েছে, উদ্যম আর সৃজনশীলতাকে প্রাধান্য দিয়েছে। আয়োজনে এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের অভিব্যক্তি তুলে ধরার পর আগত অভিভাবকরা তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন’ আমরা আজ নিশ্চিন্ত, আজ আমরা আশাবাদী, আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আমরা শিক্ষকনামক এমন অভিভাবকের হাতে আমাদের সন্তানদের তুলে দিয়ে আনন্দিত। এ অনুষ্ঠান তাদের জীবনে বিরল এবং তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন অনেকে।
আজ ৫ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে দশটায় সতেন্দ্রনাথ দত্ত একাডেমিক ভবনের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের মিলনায়তন উঠানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার ডিসিপ্লিনের পক্ষ থেকে প্রথম ব্যাচের দ্বিতীয় টার্ম পরীক্ষা শেষে টার্ম রিভিউ শীর্ষক এমন এক ব্যতিক্রমধর্মী অভূতপূর্ব আয়োজন করা হয়। গতকালই এ পরীক্ষা শেষ হয়। আয়োজক কমিটির আহবায়ক ডিসিপ্লিনের শিক্ষক পুনম চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আইন স্কুলের ডিন প্রফেসর ড. মোঃ ওয়ালিউল হাসানাত। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. এস এম রফিজুল হক ও ছাত্রবিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. আশীষ কুমার দাস। অনুষ্ঠানের শুরুতে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন ডিসিপ্লিনের প্রথম ব্যাচের (১৭ ব্যাচের) কোর্স কো-অর্ডিনেটর শিক্ষক তালুকদার রাসেল মাহমুদ। এর পর ডিসিপ্লিনের ৩৮জন শিক্ষার্থী সংক্ষিপ্তভাবে একে একে তাদের অভিজ্ঞতা আর অভিব্যক্তি প্রকাশ করে। এ সময় তাদের মধ্যে অনেকেই আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। সামনে বসা অভিভাবক মাকে লক্ষ্য করে বলে ‘মা আমরা এখানে ভালো আছি। আমরা যেনো তোমাদের কাছেই আছি, তোমরা যেমন আদর ¯েœহ, শাসন করতে আমাদের শিক্ষকরাও তাই করেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার ডিসিপ্লিনে পড়তে এসে এক বছরের মধ্যে আমাদের সকল হতাশা কেটে গেছে। আমরা এখন আত্মপ্রত্যয়ী। আমরা আইনের ছাত্র হিসেবে জীবন গড়বো, আমরা একদিন নেতৃত্ব দেবো, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো। আমরা আমাদের শিক্ষকদের কাছে ঋণী।’
প্রধান অতিথি তাঁর বক্তৃতায় বলেন বিশ্বব্যাংকের নিকট থেকে লোন নিয়ে বর্তমান সরকার উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও এ প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি বলেন একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শিক্ষার্র্থীদের উপযুক্তভাবে গড়ে তুলতে আইন ও বিচার ডিসিপ্লিন বদ্ধপরিকর। আমরা সেভাবেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যচ্ছি। তিনি অভিভাবকদের প্রতি তাদের সন্তানদের বিষয়ে নিয়মিতভাবে খোঁজখবর রাখার অনুরোধ জানান যাতে তাঁরা বিপথগামী না হতে পারে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার ডিসিপ্লিন চালু করা এবং এ ডিসিপ্লিনের কার্যক্রমকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান, বিভিন্ন বিষয়ে উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রদানের জন্য উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামানকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রেজিষ্ট্রার বলেন আপনাদের দুঃশ্চিন্তার কিছু নাই। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নয়, এখানে সেশনজট নাই, রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস। এ বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে। এখানে সবাই নিরাপদ, সবচাইতে বড় কথা হলো নতুন ডিসিপ্লিন হলেও একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক দ্বারা এ ডিসিপ্লিন পরিচালিত হচ্ছে।
ছাত্রবিষয়ক পরিচালক বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য একটি প্রতিষ্ঠিত ডিসিপ্লিনের একজন শিক্ষক হয়ে আমরা যা করতে পারিনি, আমাদের শিক্ষা জীবনে যা পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি তা পেয়েছে আইন ও বিচার ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা। তারা প্রথমেই অত্যন্ত ভালো শিক্ষা নিয়ে, পরিবেশ নিয়ে যাত্রা করলো। তারা ভবিষ্যতে ভালো করবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ তাদের পিছনে সরকার যে অর্থ ব্যয় করে তার উৎস এদেশের কৃষক-শ্রমিক, মেহনতি মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ। শিক্ষক তালুকদার রাসেল মাহমুদ উদ্বোধনী বক্তৃতায় গত এক বছরে ডিসিপ্লিনের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ও অর্জন পাওয়ার পয়েন্টে তুলে ধরে বলেন আমরা সাধ্যাতিতভাবে চেষ্টা করেছি। কেবল ক্লাসের শিক্ষাই নয়, সহশিক্ষা কার্যক্রমের দিকেও গুরুত্ব দিয়েছি যাতে তারা পরিপূর্ণভাবে শিখতে পারে, ভালো মানুষ হয়ে গড়ে ওঠে। সভাপতির বক্তৃতায় শিক্ষক পুণম চক্রবর্তী বলেন আজ আমাদের ডিসিপ্লিনের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন কারন এখানে আইন ও বিচার ডিসিপ্লিন পরিবারের সবাই উপস্থিত। এই উপস্থিতি মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। আমরা শিক্ষক হয়ে কেবল পড়াই না আমরা চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হতে। এ সময় উপস্থিত ৩৭জন অভিভাবকদের পক্ষ থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বক্তব্য রাখেন মোঃ মাহবুবুল আলম, বিলকিস খান ও ফারজানা ফেরদৌস কনিকা। পরে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ডিসিপ্লিনের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।